নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৫ । অনলাই
মাফুজুর রহমান মোল্যা।
WORLD NEWS 22e,নিউজ ।
দেশে বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল সেটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এর মূলে ছিল তরুণদের চাকরি না পাওয়ার হতাশা। সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থাকে তারা দেখেছেন বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে। দেশের অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন যে উন্নয়নের বয়ান দেওয়া হয়েছিল তাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান হয়নি সেটি স্পষ্ট। ‘জবলেস গ্রোথ’ বা কর্মহীন প্রবৃদ্ধির সেই বয়ানে তরুণদের অংশ ছিল নগণ্য। জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের অর্থনীতির সঠিক চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করছেন অন্তর্বর্তী সরকার।
আরো পড়ুন
এরই মধ্যে অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছে। দেশ থেকে অর্থ পাচার এবং উন্নয়ন গল্পের আড়ালের অর্থনৈতিক দুরবস্থার চিত্র উঠে আসছে। অবশ্য ২০২৪ সাল শুরুর আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা আর কর্মসংস্থান বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ ছিল। নতুন বছরের শুরুতেও একই চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে শুরু হলো। বছর জুড়ে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীদের কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কমে গেছে। অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন না। বিনিয়োগের ওপর এমন নেতিবাচক প্রভাবের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সেভাবে তৈরি হয়নি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই চাপ নতুন বছরেও থাকবে। বিদায়ি বছর জুড়ে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে ভুগেছেন উদ্যোক্তারা। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার খরচ বেড়েছে। ডলারসংকট ও ডলারের উচ্চমূল্য এবং বছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রপ্তানিকারকেরা সেভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণে যাননি। চাপ সামলাতে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও গত পাঁচ মাসে বড় গতি পায়নি অর্থনীতি। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, রাজস্ব আদায় ও বাজেট বাস্তবায়নের গতি কমেছে। কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে রিজার্ভ আর রেমিট্যান্সে। এ সময়ে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো অর্থনীতির সংকটকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শ্বেতপত্রের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কোন কোন খাতে সমস্যা সেগুলোর ধারণা পাওয়া গেছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন নতুন বছরে তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। এগুলো হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে সংস্কার এবং বাজেটের প্রস্তুতি। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, নতুন বছরে সবার আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে অনেক ওপরে রয়েছে, এটা কমাতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক এই মুখ্য অর্থনীতিবিদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পুরোনো কৌশল কাজে আসছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু উদ্যোগ নিয়েছে কিন্তু এটি পর্যাপ্ত নয় বলে তিনি মনে করেন। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দেন তিনি। অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন ড. জাহিদ হোসেন। সংস্কারে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নতুন বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত দেশের আর্থিক খাতে। দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। বছরের শুরুতেই এই উদ্যোগ নিতে হবে যাতে করে সাধারণ বিনিয়োগকারী, গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসে। তৃতীয়ত, বাজেটের প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার একটি বাজেট দিতে পারবে। এজন্য এই বাজেটে তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো গুরুত্ব পাবে। বাজেটে অর্থের সংস্থান করা এবং ঘাটতি কমিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ থাকবে। তিনি বলেন, খরচ কমিয়ে সামাজিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য বাজেট ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকার মধ্যে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে, বাড়েনি কর্মসংস্থান
দেশে বিনিয়োগের গতি আগে থেকেই শ্লথ বা স্থবির। ব্যবসার পরিবেশ উন্নতির মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে বছরের পর বছর। এর পরেও পরিস্থিতির উন্নতি খুব কমই বলা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলা গত অর্থবছরের একই সময়ে তুলনায় ২৬ শতাংশ কমেছে। একইভাবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি কমার মানে হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণ কমেছে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়া কমেছে। গত অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা গত ৪১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগ না বাড়লে দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে না। এ চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানেও উঠে আসে। বছরের প্রথমার্ধে দেশে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে জুন শেষে শ্রমশক্তির ২৬ লাখ ৪০ হাজার মানুষ বেকার ছিলেন। এই সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৪০ হাজার বেশি। বিবিএসের ২০২৪ সালের জুন মাসের ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে বিনিয়োগ শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বেশি কিছু প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়েছে। তাতে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর অনেক ব্যবসায়ী যারা রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তারা জেলে বা পলাতক রয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানেও বেকার হয়েছেন বহু শ্রমিক। শুধু অস্থিরতার কারণে গত বছর বিনিয়োগ কমেছে, তা নয়। বছরের পর বছর বিভিন্ন সমস্যার কারণে আগে থেকেই বিনিয়োগে গতি কম। জিডিপির শতকরা হিসাবে বেসরকারি বিনিয়োগ তিন বছর ধরে কমছে।
শ্বেতপত্রে দুর্নীতির চিত্র :বিদায়ি ২০২৪ সালের অন্যতম বড় উদ্যোগ ছিল অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ। এতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, গড়ে প্রতি বছর গেছে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। দেড় দশকে সরকারি কেনাকাটা থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকা ঘুষ খেয়েছেন রাজনীতিবিদ ও আমলারা। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রকল্প থেকে লুটপাট হয়েছে পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা। আর শেয়ার বাজার থেকে আত্মসাৎ করা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা।
বছর জুড়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি: বিদায়ি বছরে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ে। টানা আট মাস খাদ্যমূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, গত নভেম্বর মাসে খাদ্যমূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ, যা গত সাড়ে ১৩ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। গত জুলাই মাসে খাদ্যমূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ১০ শতাংশে উঠেছিল।
রাজস্ব ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে :অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসের মধ্যে তিন মাসেই গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় কমেছে। সর্বশেষ নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে রাজস্ব ঘাটতি আগের মাসের চেয়ে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ৪২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি না ফেরায় সরকারের রাজস্ব কমে গেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। সেই সঙ্গে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমে যাওয়া কিংবা বন্ধ হওয়াও রাজস্ব কমার পেছনে কারণ হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কেবল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নয়, আলোচ্য সময়ে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায়ও রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ, যার পরিমাণ ৩ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতি :পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চলতি (২০২৪-২৫) অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতিতে এগোচ্ছে। চলতি অর্থ বছর মোট বরাদ্দ ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৮ কোটি। পাঁচ মাসে খরচ হয়েছে মাত্র ৩৪ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। বাকি সাত মাসে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৪ কোটি টাকা খরচ একপ্রকার অসম্ভব বলা চলে। এডিপি কাটছাঁটের কাজ শুরু করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ চাহিদা ও খরচের ওপর নির্ভর করে কমানো হবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি।
কিছুটা স্বস্তি রেমিট্যান্স আর রিজার্ভে :বিগত দুই বছর ধরে ডলারের সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকার বদলের পর ড. আহসান এইচ মনসুর নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ করে দেন। পাশাপাশি ডলারের দাম ১২০ টাকা নির্ধারণ করেন এবং তা আড়াই শতাংশ পর্যন্ত কমবেশি করার সিদ্ধান্ত দেন। এতে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে ডলারের বাজার। এদিকে প্রবাসী আয়ও বাড়ে। এতে রিজার্ভের পতন থেমেছে, এখন তা বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের দাম পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে। অবশ্য এর ফলে গতকাল ব্যাংকগুলোতে ১২২ টাকা দরে ডলার বিক্রি হয়েছে। অর্থনীতির এই চাপেও কিছুটা সুখবর রয়েছে রেমিট্যন্স প্রবাহে। গত ডিসেম্বর ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এটি মাসভিত্তিতে রেকর্ড। অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলার বিক্রি বন্ধ রাখার কারণে রিজার্ভের পতনও থেমেছে। ২০২৪ সালে শেষ পর্যন্ত দেশের পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা আছে। তবে প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায়ই অসন্তোষ দেখা দেয়। পণ্য রপ্তানির পরিসংখ্যান নিয়ে বড় কেলেঙ্কারিও ফাঁস হয় চলতি বছর। ফলে রপ্তানি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দেখানো নিয়ে অনেক দিন ধরে যে অভিযোগ ছিল, তার অবসান ঘটে। তাতে পণ্য রপ্তানি একলাফে ৫৫ বিলিয়ন বা ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৪ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারে নেমে আসে।

0 Comments